PropellerAds
দ্বারকা –  সমুদ্রে তোলিয়ে যাওয়া শ্রী কৃষ্ণের সাম্রাজ্য
Dwarkadhish Temple, of Lord Krishna, Dwarka ,Gujarat

দ্বারকা – সমুদ্রে তোলিয়ে যাওয়া শ্রী কৃষ্ণের সাম্রাজ্য

সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছিলো। রাত এ ঘুম কম হচ্ছিলো, পাতে লুচি তরকারি পড়ছিলো না, রবিবার এ পাঁঠা হচ্ছিলো না, আর ভালো করে চপ ও ভাজতে পারছিলাম না, মানে সে এক চরম অরাজকতা চলছিল জীবনে। কিছুক্ষন ভাবার পর মনে হোলো,  অরে আমার পাপ কি এতটাই বেড়ে গাছে যে বৃহস্পতিবার আর শনিবার যে বুকে হাত চেপে নিরামিষ খাচ্ছি সেটাও কিছু   ঠেকাতে পারছেনা ! নাহঃ এবারে আর গোয়া না, ভগবানের দর্শন করতেই হবে।তাই চার ধামের একধাম শ্রী কৃষ্ণের দ্বারকা।

ভগবান শ্রী কৃষ্ণ মথুরা তে জন্ম গ্রহণ করলেও তার প্রধান সাম্রাজ্য ছিল দ্বারকা, গুজরাট। সংস্কৃত এ যার অর্থ হলো স্বর্গদ্বার। পুরান অনুযায়ী দ্বারকার অনেক নাম ছিল, যেমন মোক্ষপুরী, দ্বারকমতি, দ্বারকাবতী। দ্বারকা ভারতের পচিম উপকূলে গোমতি নদীর তীরে গুজরাটের ওখাতে অবস্থিত। এই তিনটে লাইন লিখে কেমন যেন একটা ২ নম্বর এর টিকা লিখছি টিকা লিখছি মনে হচ্ছে।

  • মন্দির টি মোট ৭২ টি পিলার এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নানা ভয় পাবেন না, ভেঙে পড়বে না। যদিও এখনকার কলেজ বাংক মারা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলে বলতে পারতাম না।
  • মন্দিরের উচ্চতা ৮০ মিটার।
  • উত্তর দ্বার এ গেলে আপনি মোক্ষ লাভ করতে পারেন,তাই এর নাম মোক্ষদ্বার।
  • দক্ষিণ দ্বার দিয়ে বেরোলে আপনি স্বর্গে চলে যেতে পারেন, তাই এর নাম স্বর্গদ্বার। তাবলে যমালয়ে জীবন্ত মানুষের মতো ষাঁড় নিয়ে যাবেন না প্লিজ।
  • এখানে জন্মাষ্টমী, হোলি আর রুক্মিণী বিবাহ উৎসব পালন করা হয়।
  • মন্দির ভোর ৬ তা থেকে দুপুর ২ টো এবং বিকাল ৫ তা থেকে রাট ৯ তা ৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্যে।
  • মন্দিরের পতাকা দিনে ৫ বার পাল্টানো হয়। আর ওই পতাকার সাথে ৫২ টি আরো ছোট পতাকা লাগানো থাকে যা ৫২ টা যাদব সাবকাস্ট কে চিহ্নিত করে।

পুরান মতে, দ্বারকার অদ্ভুত রোমাঞ্চকর একটা পৌরাণিক গল্প আছে। গুজরাটের প্রথম রাজধানী ছিল দ্বারকা। চার ধামের একধাম হলো দ্বারকা, আর বাকি তিন ধাম হলো বদ্রীনাথ , জগন্নাথ পুরি , রামেশ্বরম। দ্বারকা ভারতের সাতটা প্রধান প্রাচীন ধর্মীয় স্থানের মধ্যে পড়ে। বাকিগুলো হলো মথুরা, অযোধ্যা, বেনারস, হরিদ্বার, উজ্জয়ন কাঞ্চিপুরাম।

পৌরাণিক মতে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ হলেন ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। ভগবান বিষ্ণু কিন্তু এই দ্বারকাতেই শঙ্খসুর নামক রাক্ষস কে বধ করেছিলেন। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিষ্ঠুর কংস মামাকে মথুরাতে হত্যা করেছিলেন। আবার মামা কংসের শ্বশুর মশাই ছিলেন প্রভাবশালী রাজা জরাসন্ধ। এবার অবশ্যই জামাই এর হত্যা কে ভালো চোখে দেখেন নি উনি। প্রতিশোধ নিতে আক্রমণ করেছিলেন ১৭ বার। এতে মথুরা সাম্রাজ্যের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও অনেক প্রাণহানি হয়। অগত্যা ভগবান শ্রী কৃষ্ণ প্রজাদের প্রাণহানির আশঙ্কায় তাঁর যাদব সম্প্রদায় কে নিয়ে সাম্রাজ্য স্থানান্তর করলেন মথুরা থেকে কুশাস্থলী তে , যার বর্তমান নাম দ্বারকা।

এরপর উনি একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার ভগবান বিশ্বকর্মা কে তলব করে ওনার জন্য একটা প্ল্যানড সাম্রাজ্য বানাতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু উনি শ্রী কৃষ্ণ কে বললেন যে সমুদ্রদেবের কাছ থেকে আরো কিছু প্লট এর দরকার। এরপর আর কি, আর্জি মঞ্জুর হয়ে গেল। সমুদ্রদেবতা তুষ্ট হয়ে ১২ যোজন জমি প্রদান করলেন। তবু ভালো , নাহলে এখনকার দিনে বেশ বেগ পেতে হতো কিন্তু। কারণ তখন তো এগ্রিকালচার ল্যান্ড আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যান্ড বলে কিছু ছিল না। বিশ্বকর্মা মাত্র ৩ দিনে সোনায় মোড়া এক বিশাল সাম্রাজ্য বানিয়ে উপহার দিলেন শ্রী কৃষ্ণ কে। হবে না কেন, তখনকার দিনে তো আর সিন্ডিকেটের ঝামেলা ছিল না। এরপর থেকেই একে বলা হতো সুবর্ণ দ্বারকা বা স্বর্ণ দ্বারকা।

ভগবান শ্রী কৃষ্ণ পাশের এক দ্বীপ বেট দ্বারকা থেকে তাঁর সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। দুৰ্ভাগ্যবশত এক বিষাক্ত তিরের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর মারা যাবার পর সমুদ্রদেব তাঁর সাম্রাজ্যকে আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে নেন। এখন যে দ্বারকা আপনারা দেখেন সেটা পরে স্থাপন করা হয়েছে। এখনো সমদ্রের নিচে পুরানো দ্বারকার অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এমন কিছু ধ্বংসাবশেষ পেয়েছে তাতে প্রমান হয়েছে যে এগুলো গল্প হলেও সত্যিই।

Journey to Dwarka from Jamnagar

দিনটা ছিল শীতের, কুয়াশা ভরা ভোর আর হালকা ঠান্ডা। মানে বেড়ানোর মোক্ষম সুযোগ। সফর শুরু করলাম সকাল সাড়ে ৬ টায়ে। আমরা বাঙালিরাই জানি, শীতকালে ভোরবেলা তে ওঠা কি কর্ম। তাও উঠতে হলো কারণ দ্বারকা , ভেট দ্বারকা আর নাগেশ্বর এই তিনটে জায়গা একসাথে কভার করার কথা ছিল। যদিও আমি এখানে শুধু দ্বারকা নিয়ে লিখছি। বাকিটা পরের ব্লগ এ দর্শন করাবো। ন্যাশনাল হাইওয়ে তে কোনো ট্রাফিক জ্যাম না থাকায় আমাদের টাটাসুমো ঘন্টায় ৮০ কিমি বেগে ছুটছিল। তারপর ৮ তা নাগাদ গাড়ি দাঁড় করিয়ে গুজরাটের ফেফরা, ধোকলা দিয়ে ব্রেকফাস্ট টা সেরে ফেললাম। 

 

 

Dwarka temple outer entrance gate

দ্বারকা থেকে জামনগরের দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিমি। পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৯ টা হয়ে গেল। প্রায় ৩ ঘন্টা লাগলো। ট্রেন গেলে যদিও ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট লাগতো। কার পার্কিং সাধারণত বাইরে থাকে আর অনেক টা হেঁটে যেতে হয় মন্দির পর্যন্ত। কিন্তু ভাগ্য ভালো ছিল তাই সেদিন ভিতর অবধি যেতে পেরেছিলাম ।

main entrance road of dwarka temple
camel outside of Dwarka temple

মিনিট দুয়েক হাঁটার পর মন্দিরের দরজা দেখতে পেলাম।

entrance of Dwarkadhish temple
luggage deposit center of Dwarkadhish temple

সাবধান ! আপনি ক্যামেরা ফোন বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র নিয়ে মন্দিরের ভিতরে যেতে পারবেন না। তাই লাগেজ রুমে একটা ব্যাগে সব রেখে জমা করে দিন, রিসিট কপি নিতে কিন্তু ভুলবেন না।

মন্দিরে ঢোকার লাইন এখান থেকে চালু হয় কিন্তু সেদিন ভিড় কম থাকায় বেশি লাইন দিতে হয়নি। এটা হাই সিকিউরিটি জোনে তাই আপনাকে পুরো চেক করা হবে। ভিতরে ক্যামেরা আল্যাউড নয় , তাই আপনাদের ভিতরের ছবি দেখতে পারছিনা। মন্দিরে ঢোকার পর অত্যন্ত ঢিমে তালে লাইন এগোতে থাকে। আধঘন্টা পর অবশেষে দর্শন হলো ভগবান শ্রী কৃষ্ণের কালো মার্বেল এর মূর্তির। প্রধান মন্দিরের মধ্যে আরো অনেক ছোটো ছোটো মন্দির দেখতে পাবেন রাধা কৃষ্ণের। দেখতে পাবেন চারিদিক সব ভক্তরা ভোজন কীর্তন করছে। মন্দিরে প্রবেশ করার পর এ আমি এক আধ্যাত্মিক ভাব অর্থাৎ পসিটিভ এনার্জি অনুভব করলাম। এটা কিন্তু আপনিও অনুভব করবেন। হটাৎ কিছু লোককে দেখলাম মন্দিরের তিন তলাতে ঘোরাফেরা করতে , আর কি বাঙালি বলে কথা , তাই গেলাম উঠতে। দুৰ্ভাগ্যবশত দারোয়ান মশাই দিলেন রুখে। আসলে পিছনে আরো অনেক লোক জোর হয়ে গেছিলো ওপরে ওঠার জন্য। অনেক বোঝালাম কিন্তু ওনাকে নড়ানো গেল না। অগত্যা পিছু হটতে বাধ্য হলাম, মুছধারী দারোয়ান কে নড়ানো কার সাধ্য। তারপর হটাৎ মন্দিরের ওপরে দেখলাম এক ব্যক্তিকে পতাকাটি পাল্টাতে। দিনে এটি ৫ বার পাল্টানো হয়।

The top flag of the Dwarkadhish temple
The top flag of the Dwarkadhish temple

আরে নানা প্রথমের ছবিটা পিসার হেলানো টাওয়ার নয়। ওটা আমার মতো ফোটোগ্রাফারের হাতের শিল্প। কিন্তু আপনি যদি CID দেখতেন তাহলে এটা বুঝতেন যে পতাকা দুটো কিন্তু আলাদা। এক ঘন্টা দেখে তারপর গোমতী নদীর ওপর সুদামা ব্রিজের দিকে রওনা দিলাম। সুদামা ব্রিজে যাওয়ার পথে মার্কেট থাকে স্মৃতির জন্যে ( স্মৃতি ইরানি নয়) কিছু জিনিস ও কিনতে পারেন। আমাদের পৌরাণিক জ্ঞান তো অনেক বেশি, তাই বলে রাখা ভালো, যে সুদামা হলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণের বাল্যবন্ধু। সুদামা ব্রিজ ছবি তোলার জন্য খুবই ভালো জায়গা। নিচ দিয়ে গোমতী নদী বয়ে চলেছে। এটা আসলে সমুদ্র আর নদীর সংযোগস্থল। আমার মনে হয় ছবিগুলোই সব কথা বলে দেবে।

shopping at Dwarka
shopping at Dwarka
shopping at Dwarka
shopping at Dwarka
shopping at Dwarka
shopping at Dwarka

সুদামা ব্রিজে যাওয়ার পথে মার্কেট থাকে স্মৃতির জন্যেই ( স্মৃতি ইরানি নয়) কিছু জিনিস ও কিনতে পারেন। আমাদের পৌরাণিক জ্ঞান তো অনেক বেশি, তাই বলে রাখা ভালো, যে সুদামা হলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণের বাল্যবন্ধু।

Sudama bridge Dwarka
Sudama bridge Dwarka

সুদামা ব্রিজ ছবি তোলার জন্য খুব এ ভালো জায়গা। নিচ দিয়ে গোমতী নদী বয়ে চলেছে। এটা আসলে সমুদ্র আর নদীর সংযোগস্থল। আমার মনে হয় ছবিগুলোই সব কথা বলে দেবে।

bathing ghat of Dwarka

এখান থেকে আপনি স্নানের ঘাট দেখতে পাবেন।

Dwarka temple from Sudama bridge
sitting arrangement on the Gomati river bank, Dwarka

সরকার নদীর ধারে সুন্দর বসার জায়গা করে দিয়েছে যেখান থেকে আপনি মন্দিরটিও দেখতে পাবেন।

Camel ride on the Gomati river bank,Dwarka
Camel ride on the Gomati river bank,Dwarka

কিছু আকর্ষণের মধ্যে উটের পিঠে চড়তে পারেন বা ডেজার্ট কারের মজা নিতে পারেন।

PropellerAds
temple on the other side of the Gomati river bank, Dwarka

প্রায় মিনিট ৪৫ লাগবে সব ঘুরে দেখতে। কিন্তু আপনি বেশিও নিতে পারেন। কিন্তু বেত দ্বারকা মন্দির ১২ টা ৩০ মিনিট এ বন্ধ হয়ে যায়। তাই তাড়াতাড়ি আবার বেরিয়ে গেলাম।

শ্রী কৃষ্ণ : A man is made by his beliefs. As he believes, so he becomes .

time table of Dwarka temple

দ্বারকার সময়সূচী

আশা করি উপভোগ করেছেন। চেষ্টা করলাম ছবি আর লেখা দিয়ে দ্বারকা কে তুলে ধরার। পরের ব্লগ থাকবে ভেট দ্বারকা আর নাগেশ্বর নিয়ে। ধন্যবাদ, আবার দেখা হবে।

Leave a Reply

Close Menu